あらすじ
পথে নামার আগে মানুষটা আমি একটু খামখেয়ালি— এটা কাছের মানুষজন স্বীকার করবেন। এই মনে করুন একটা গোটা এগ-মাটন রোল খেতে ইচ্ছে হল। সেটা না খাওয়া অবধি প্রাণটা আঁকু-পাঁকু করে। আবার ধরুন, সকালে উঠে মনে হল আজ আপিস ডুব মেরে গোটা দিনটা কোনও একটা বই নিয়ে ডুবে থাকব। যেমন ভাবা, তেমন কাজ! এরকম খামখেয়ালের নিদর্শন ভূরি ভূরি ছড়িয়ে আছে আমার জীবনে। আসলে একটা কথা খুব মন দিয়ে বিশ্বাস করি— আজ আছি, কাল নেই। এই যে মনের যা সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, সেই সব ‘পরে হবে’ বলে রেখে দিলাম আর একদিন সকালে উঠে দেখলাম যে অদ্যই আমার জীবনের শেষ রজনী, তখন? একগাদা ইচ্ছে বুকে নিয়ে এই পৃথিবীর মায়া কাটানোর মানে হয় না। সেই কে একজন মহাপুরুষ বলেছিলেন না ‘লাইফ ইজ আ ডিভাইন গিফট’? সুতরাং যা প্রাণে চায় করে নেওয়া উচিৎ। এই পৃথিবীতে এত কিছু আছে, যে সবকিছু নিজের চোখে এক জীবনে দেখে যাওয়াটা সম্ভব নয়, বুঝে গেছি। কচ্ছপ হলে তাও না হয় তিনশ বছর সময় থাকত। কিন্তু তা নই যখন, ম্যান ইজ মর্টাল বলে এই ধরার বুকে জন্মে গেছিই যখন ‘আর বিলম্ব নয়!’ কথায় বলে, পায়ের তলায় সর্ষে। ছোটবেলায় ঠান্ডা লাগলে মা সর্ষের তেল নিয়ে পায়ের তলায় ঘষে দিত বটে। সেই সময় ভগবান আশেপাশে কোথাও হয়তো ইভনিং ওয়াক করতে বের হয়েছিলেন। স্বচক্ষে দেখে ফেলেছিলেন আর কী! সেই থেকে আমার পায়ের তলার সর্ষেগুলো এখনও ছাড়ানো যায়নি। আমিও তার উপরেই রোলার স্কেটিং করে চলেছি। অবশ্য এ ব্যাপারে ছোটবেলায় পায়ের তলায় তৈলমর্দন করা ছাড়াও মা-বাবার কিঞ্চিৎ অন্যান্য ভূমিকাও যে ছিল, সেটাও স্বীকার করতেই হয়। ইঞ্জিনে স্টার্ট দেওয়া। মানে নিজেদের পায়ের তলার সর্ষেগুলো আসলে আমার পায়ের তলায় চালান করেছে। আমার প্রথম বেড়াতে যাওয়া আমার ছ-মাস বয়সে। পুরী। আমি প্রোফেসর শঙ্কু নই। সুতরাং ওই সময়ের ঘটনার সাক্ষ্য শুধুমাত্র মায়ের বাবার মুখে শোনা গল্প আর ফোটোগ্রাফ। এরপর অনেক ছোটখাট বেড়ানো বাদ দিলে এক বছর বয়সে দার্জিলিং সিকিম, দু-বছর বয়সে রোটাং পাস, চার বছরে কেদারনাথ-বদ্রীনাথ… এমন লম্বা টাইমলাইন। এর মধ্যে রোটাং পাসে গিয়ে নাকি আমি ঠান্ডায় জমে শক্ত হয়ে গেছিলাম। তারপর সে অনেক কাণ্ড করে আমার জ্ঞান ফেরানো হয় এবং নামা হয়। তা যাই হোক, মোদ্দা কথা ওই যে, বেড়ানোর নেশাটা রক্তে বয়ে বেড়াই। সাথে আছে অল্পস্বল্প ট্রাভেল ফোটোগ্রাফির নেশা। সেটাও পৈত্রিকসূত্রে লাভ করা। সাথে সহধর্মিনীটিও এখন বেড়ানোর কথায় এক পায়ে খাড়া। আমার চেন্নাইবাসের প্রায় আট বছর হতে চলল। এই আট বছরের কিছুদিন কেটেছে পড়াশোনায়। তার মধ্যে বিয়ে হয়েছে চার বছর। এই চার বছরে দক্ষিণ ভারতে চেন্নাই-এর কাছে পিঠে উইকেন্ড গেটওয়েগুলো তো ঘুরেই ফেলেছি, তার সাথে ঠ্যাং বাড়িয়ে একবার মালেশিয়া আর ভারতবর্ষের অন্যান্য আনাচ-কানাচও উঁকি মেরে দেখা হয়ে গেছে। সাথে জুটেছে আমার এই প্রবাসের বন্ধুরা আর আমার ইস্কুলের বন্ধু অভীক। অভীকের উৎসাহ জঙ্গলে। তাই ওর সাথে জঙ্গলে গেলে আমার জন্য বেশ একটা এজুকেশনাল ট্রিপ হয়ে যায় সেটা। বেশ কিছু পাখি প্রজাপতির নাম জানা হয়ে যায়। এমনই একবার দল বেঁধে গেলাম ভালপাড়াই। সে একটা দারুণ থ্রিলিং স্টে হল তিনদিন। ঘুরে এসে মনে হল লিখে ফেলা যাক এই দারুণভাবে কেটে যাওয়া ক-দিনের গল্প। আজ অবধি পত্রপত্রিকার পাতায় পড়া অধিকাংশ ভ্রমণ কথাতেই লেখক প্রকৃতি প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে কাব্যিক হয়ে পড়েন। আমার আবার রক্তে কাব্যদোষ নেই। কলেজে থাকতে প্রেমে পড়ে বা ব্যর্থ হয়ে সব বাঙালি ছোকরাই কাব্যি লিখেছে। সে আম্মো লিখেছিলাম। কিন্তু বন্ধুদের সাথে মজাদার ভ্রমণে কাব্যি করাটা ঠিক হবে না বলেই মনে হল। গালগপ্পো করে লিখে ফেলা সেই লেখা পড়ে বন্ধুরা পিঠ চাপড়ে বলল, ‘বাহ।’ ‘পাইনকোন’ পত্রিকায় প্রকাশ হল সে লেখা। সম্পাদক মহাশয় তো ভালো ভালো কথা বলে একেবারে মগডালে তুলে দিলেন আমায়। বললেন, আরও লেখো। আমায় আর পায় কে! তারপর মাঝে মধ্যেই লিখে ফেলা বেড়ানোর গাল-গল্পগুলো যখন পরিচিত এবং অপরিচিত মহলে মানুষজনের ভাল লাগতে শুরু করল, তখনই এই বইয়ের ব্যাপারে কথা হল রোহণদার সাথে। প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত মোট ছ-টা লেখা নিয়ে এই বইতে নিছক বেড়ানোর রোজনামচা নেই। আছে পাঠককে সাথে নিয়ে ঘোরানোর মজা। বন্ধুদের মধ্যের হাসি-হুল্লোড়। আর হ্যাঁ, আমার এই পথ-পাঁচালির সাথিদের সাথে আপনাদের পরিচয়ও করিয়ে দেব, তারা হয়ে উঠবে আপনাদেরও বন্ধু। আমার এই বেড়ানোর গালগল্পর প্রকাশের জন্য যারা মূলত দায়ী তাদের একবার আপনাদের সামনে মুখোশ খুলে না দাঁড় করালে তো চলে না! আমার গিন্নিটি এ ব্যাপারে অন্যতম কালপ্রিট। মনীষা সেই যবে থেকে প্রেম করতুম, তবে থেকে বলে আসছে, তোর একটা বই বের করা উচিৎ। সেটা অ্যাদ্দিনে সার্থক হতে যাচ্ছে দেখে সে হেব্বি খুশি। সাথে আছে অভীক। সে আমার লেখার ভুল ধরে তথ্যগত ত্রুটিমুক্ত লেখা লিখতে সাহায্য করে গেছে। আর অবশ্যই আমার এই ছাইপাঁশ লেখা পড়ে উৎসাহ জুগিয়ে যাওয়া বন্ধুরা। দেবতনু, অভিষেক, রশ্মি, অর্ণব, শুভ্রজিৎ, সুচেতনা, অরিত্রিকা, সৌম্যজিৎ, শৌভিকদা, কোলাহল, সেমন্তী, মনোনীতা, স্বাগতা… আমার শ্যালিকা মীনাক্ষী আর আরও সব বন্ধুবান্ধবেরা যাদের সবার নাম লিখতে হলে এত জায়গা লাগবে যে প্রকাশক আমায় লাঠি নিয়ে তাড়া করতে পারেন বলেই একটা সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে! তবে একজনের কথা না বললেই নয়। সে হল অনির্বাণদা। যখন বইয়ের নাম কী হবে ভেবে হাতড়ে বেড়াচ্ছি, তখন চটজলদি এই নামটা বাতলে দিয়ে এ যাত্রায় আমার সঙ্কটমোচন করেছে। আর সবশেষে ধন্যবাদ সুমিত রায়কে। বইতে সুন্দর সুন্দর ছবি এঁকে দেওয়ার জন্য। সৈকত ভট্টাচার্য
