あらすじ
আমার ছাত্রী আজকাল নিজেকে বড়ো অসহায় লাগে। সেই সঙ্গে পৃথিবী পালটে দেব ভেবে যে একটা একরোখা মেয়েকে চিনতাম, সে যেন সব কিছু প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত বোধ করে। মানুষে মানুষে সম্পর্কগুলো যেন সেই টিভি সিরিয়ালের মতো জটিল এবং অসহনীয় হয়ে উঠছে। রোগ, যন্ত্রণা এসব তো জীবনে থাকবেই— এ-ব্যাপারে অনেক কিছু মেনে নিতে হয়— মেনে নিতে অসুবিধা নেই কিছু। কিন্তু সেই কঠিন কঠোর দিনগুলোতে কাউকে একাকী সংগ্রাম করতে দেখলে আর নিজে হাজার চেষ্টাতেও তার ভার লাঘব করতে না পারলে, সংসার-সমাজ সবকিছুর উপরই ঘেন্না ধরে যায়। আমার চাকরি জীবনের প্রথমদিকে আমি তো স্কুলেই থাকতাম—সেটাই আমার ঘরবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। প্রাণের আনন্দে আমার পেশা আর নেশা মিলে এক হয়ে গেছিল। সেই সময়ে আমার কন্যাদের অসুখবিসুখ হলে অনিমাদি যেমন ঔষধ পথ্যি বকাঝকা সহযোগে তাদের যত্ন করতেন, আমি আবার তাদের আহ্লাদ করে পাশে বসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে মনোজগৎ ঠিক রাখার চেষ্টায় সিদ্ধহস্ত ছিলাম। বিভিন্ন নার্সিংহোম আর হাসপাতালে মেয়েদের মাথার কাছে বসে থাকা বা রাত কাটানোর অনেক অভিজ্ঞতা আমার কৃষ্ণনগরে থাকাকালীন হয়েছিল। সেইসময়ে লেডি কারমাইকেল স্কুল থেকে একদল বেশ ঝকঝকে আর মন কেড়ে নেবার মতো মেয়ে একাদশ-দ্বাদশে এসে ভরতি হল বিজ্ঞান বিভাগে। এদের অনেকের সঙ্গেই ছুটির পরে পড়াশোনা এমনকি কবিতা-গল্প নিয়ে আলোচনা বা অনেকসময় নদীর ধারে তাদের সঙ্গে ঘুরতেও যেতাম। সেই কন্যাদের মাঝে এক দুর্বল শরীরের সবল মেয়ে আমার মন কেড়েছিল। এ-মেয়ের চারিত্রিক দৃঢ়তা আমায় আকর্ষণ করেছিল। মেয়েটি আমার খুবই অসুস্থ থাকত। প্রতিটি পরীক্ষার আগেই তার মাথার কাছে নার্সিংহোমে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ভগবানকে ডাকা আমার এক কাজ ছিল। তবে সাংসারিক বা শারীরিক কোনও ঝড়-ঝাপটা তাকে কখনও পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত করতে পারেনি। নিজেকে সে তিলেতিলে গড়ে তুলেছিল এক দরদী শিক্ষিকারূপে। এমন কোনও শিক্ষকদিবস আমার জীবনে আসেনি, যেদিন সকালের প্রথম শুভেচ্ছা তার কাছ থেকে আসেনি। একদিন নিমন্ত্রণ পেয়ে সেই মেয়ের বিয়েতেও গেলাম। ভেবেছিলাম আমার মেয়েটার এবার সংগ্রামের জীবন শেষ হল— ভালোবাসার কাঙাল মেয়ে এবার একটু সুখের মুখ দেখবে। ভাবি এক আর পরিণতি হয় গল্পের চেয়েও করুণ। প্রথম সন্তান জন্মানোর পরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়। দ্বিতীয় বাচ্চার ‘ক্লাব ফুট’-কে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার ব্যাপারে তার একক সংগ্রাম দেখে আমি গর্ব অনুভব করেছি প্রতিটি মুহূর্তে। আর কত যুদ্ধ সইবে এই দুর্বল শরীর— সুদূর মুম্বইতে বসে অসুস্থ মা আর শিশু কন্যা নিয়ে একাই নিজের বন্ড সই করে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকে আর শেষ হলে আমাদের চিন্তামুক্ত করার জন্য ফোন করে। কাঁদলে সান্ত্বনা দেয়। আমার মেয়েটি তার নীরব অভিমান কবিতার মাধ্যমে ফেসবুকের পাতায় অপারেশনের পরে ঘুম না এলে লিখে যায়। আমায় বলে মাঝে মাঝে— দিদিমণি আপনি ‘উড়ান’ পড়ে কাঁদেন আমার জীবনের উপন্যাস লিখলে আপনি কী করবেন! মনের মাঝে ইচ্ছে জাগে— সত্যিই তো সে যদি তার জীবনের উপন্যাসখানি সবার হাতে হাতে ঘুরতে দেখে তাহলেও তো শান্তি পায়। আমার কন্যারা যে-যার কাজে ব্যস্ত আর আমার নিজের ক্ষমতাও খুব সীমিত, এই জীবন-উপন্যাসকে তুলে ধরার জন্য। হঠাৎ মনে হল, ঝুমার দেওয়া ‘সিয়েরা লিওনে শিহরণ’ বইটি পড়ার পরে এক অদ্ভুত শিহরন জেগেছিল মনে। আর আমি তা ব্যক্ত করেছিলাম ফেসবুকের পাতায়। সেই সুবাদে কবে যে লেখক বিভাস আমার কাছের মানুষ হয়ে গেল সে দিনক্ষণ আমি মনে করতে পারি না। তার কাছে যেন সব চাইতে পারি, আর সেও ইচ্ছেপূরণ মধুসূদন দাদার মতন দেশের দশের সব চাওয়া পূরণ করতে পারে অক্লেশে। আমাদের এই সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দিল পরিশেষে বিভাসই। তার এই সোনা দিয়ে বাঁধানো মনটিকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করতে চাই না। ঈশ্বরের কাছে এইটুকুই প্রার্থনা, ঘরে ঘরে এমন সহস্র বিভাসের জন্ম দিও, যাদের প্রাণ দেশের ও দশের দুঃখে কাঁদে। শুক্লা রায় প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা কৃষ্ণনগর গভঃ গার্লস স্কুল, বেথুন কলেজিয়েট স্কুল, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল